সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী ও তার মা সন্ধ্যা রাণী ধর। ছবি: কালবেলা গ্রাফিক্স
কারাগারে থাকা ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে একনজর দেখার আকাঙ্ক্ষা ছিল মা সন্ধ্যা রাণী ধরের। অসুস্থ অবস্থায় ছেলেকে কাছে পেতে পরিবারের পক্ষ থেকে তার প্যারোলে মুক্তির আবেদনও করা হয়েছিল। তবে তখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারকে জানানো হয়েছিল, অসুস্থ স্বজনকে দেখতে প্যারোলে মুক্তির বিধান নেই। স্বজন মারা গেলে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ রয়েছে বলেও জানানো হয়েছিল পরিবারকে।
শেষ পর্যন্ত ছেলেকে দেখা হলো না সন্ধ্যা রাণী ধরের। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তিনি মারা গেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর এবার চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছে তার পরিবার।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে এ আবেদন করেন চিন্ময়ের বড় ছেলে রঞ্জন কুমার ধর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের প্রবর্তক শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির পরিচালনা কমিটির অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তী।
স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস বলেন, ‘চিন্ময় প্রভুর প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে। তার মায়ের মৃত্যু সনদসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে। এখন আবেদনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
তিনি বলেন, সন্ধ্যা রাণী ধরের মরদেহ বর্তমানে পুণ্ডরীক ধামে রাখা হয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। চিন্ময়ের তিন ছেলে ও পরিবারের অন্য সদস্যরা সেখানে উপস্থিত আছেন। প্যারোলে মুক্তির অনুমতি না মিললে পরিবারের সদস্যরাই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।
চিন্ময়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিষয়ে স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস বলেন, তিনি পাঁচটি মামলায় জামিন পেয়েছেন।
তবে প্যারোলে মুক্তির আবেদনটি এখনো তার কাছে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক।
তিনি বলেন, ‘আবেদন এখনো আমার কাছে আসেনি। আবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।’
তবে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো বিচারাধীন থাকায় শুধু জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই বিষয়টি নিষ্পত্তি নাও হতে পারে। প্যারোলে মুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তার মা সন্ধ্যা রাণী ধর ছেলেকে একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে আসছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে চিন্ময়ের প্যারোলে মুক্তির আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু স্বজনের অসুস্থতার কারণে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ নেই বলে পরিবারকে জানানো হয়।
এরই মধ্যে বুধবার চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেয় বাংলাদেশ সনাতন পার্টি (বিএসপি)। স্মারকলিপিতে চিন্ময়ের অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় দেখার অনুরোধ জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন হাজতে থাকার কারণে মায়ের সংকটাপন্ন অবস্থায় তার পাশে থাকার সুযোগ থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বঞ্চিত হচ্ছেন।
কিন্তু সেই সাক্ষাৎ আর হলো না। মায়ের মৃত্যুর পর এবার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছেন চিন্ময়ের বড় ছেলে।
এদিকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মায়ের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে সনাতন জাগরণ জোট। একই সঙ্গে চিন্ময়ের প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল, বিভ্রান্তিকর বা অসমর্থিত তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার জোটের পক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান জোটের প্রতিনিধি প্রসেনজিৎ কুমার হালদার।
বিবৃতিতে বলা হয়, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মায়ের মৃত্যুতে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের নেতারা গভীরভাবে শোকাহত। চিন্ময়ের প্যারোলে মুক্তির জন্য তার পরিবার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংগঠনটি সব সময় চিন্ময়ের পরিবার এবং তাদের দেখাশোনা ও সহযোগিতার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকার আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছে জোট। এর মাধ্যমে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস তার মায়ের শেষকৃত্য ও পারিবারিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন বলেও আশা প্রকাশ করা হয়।
একই সঙ্গে প্যারোলের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের ভুল, বিভ্রান্তিকর বা অসমর্থিত তথ্য প্রচার না করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জোটের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, এমন কোনো অতিরঞ্জিত বা অপরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত নয়, যার কারণে চিন্ময়ের প্যারোলে মুক্তির আইনগত প্রক্রিয়া কোনোভাবে ব্যাহত হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে ধৈর্য, সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এরপর তার সমর্থকেরা প্রিজন ভ্যান ঘিরে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে চিন্ময়কে কারাগারে নিয়ে যায়।
সূত্র- কালবেলা অনলাইন




