ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। সিলেটের জাফলং শুধু পাহাড়, নদী আর পাথরের সৌন্দর্যের জন্যই পরিচিত নয়; এর মাটির নিচে ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন নিদর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় অধ্যায় জাফলং রাজবাড়ি

জাফলং নদীর তীরবর্তী বল্লাপুঞ্জি-জুমপার এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন স্থাপনার এখন আর আগের সেই জৌলুস নেই। কালের বিবর্তনে মূল রাজবাড়ি ও রাজধানীর অধিকাংশ স্থাপনা হারিয়ে গেছে। তবে দুটি ফটক ও দেয়ালের কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। আর সেই ধ্বংসাবশেষই আজও ইতিহাসের নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

ইতিহাসবিদদের কাছে জাফলং রাজবাড়ির পরিচয় নিয়েও রয়েছে মতভেদ। কারও মতে, এটি ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের একটি খণ্ডরাজ্যের রাজধানী ও রাজবাড়ি। আবার অন্য ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল রহস্যময় মালনিয়াং বা মাদুর মাস্কুট রাজ্যের রাজধানীর রাজবাড়ি।

জৈন্তিয়ার মূল রাজধানীর বাইরে আরও তিন রাজবাড়ি

জৈন্তিয়া রাজ্যের মূল রাজধানী ছিল জয়ন্তীপুর—বর্তমানে নিজপাট নামে পরিচিত। তবে ইতিহাস ও জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, মূল রাজধানীর বাইরে জৈন্তিয়া রাজ্যের আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজবাড়ি বা খণ্ডরাজ্য ছিল—জাফলং, চারিকাটা ও ফালজুর

এসব রাজবাড়ির সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দালিলিক তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে জনশ্রুতি, স্থানীয় কিংবদন্তি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিকের গবেষণার ওপর নির্ভর করেই এসব স্থাপনার ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে।

বর্তমানে জাফলং রাজবাড়ির কিছু অংশ টিকে থাকলেও চারিকাটা ও ফালজুরের রাজবাড়ির প্রায় কোনো অস্তিত্বই নেই।

‘মাইলং রাজার বাড়ি’ থেকে জাফলং রাজবাড়ি

স্থানীয় মানুষের কাছে একসময় জাফলং রাজবাড়ি ‘মাইলং রাজার বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল।

‘জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজের মতে, মাইলং রাজা ছিলেন জৈন্তিয়ার পুরোহিত রাজবংশের শেষ রাজা জয়ন্ত রায়ের পুত্র। পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে রাজা জয়ন্ত রায় জৈন্তিয়া রাজ্যকে কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে ভাগ করে তাঁর সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করেছিলেন। তখন জাফলংকে একটি খণ্ডরাজ্য হিসেবে গড়ে তুলে এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মাইলং রাজাকে।

জাফলং নদীর তীরেই গড়ে ওঠে ওই খণ্ডরাজ্যের রাজধানী। আর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর অন্যতম ছিল রাজবাড়িটি।

তবে আজ যে অংশটুকু দেখা যায়, সেটি মূল রাজবাড়ির খুব সামান্য অংশ। দীর্ঘ সময়ের ক্ষয়, প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে রাজধানী ও রাজবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা হারিয়ে গেছে।

টিকে থাকা দেয়ালের পুরুত্ব এবং ফটকের নির্মাণশৈলী দেখে ধারণা করা হয়, এগুলো জৈন্তিয়ার অন্যান্য অনেক স্থাপনার তুলনায় প্রাচীন।

আসলে কি এটি ছিল মালনিয়াং রাজ্যের রাজবাড়ি?

জাফলং রাজবাড়ির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য এখানেই।

অন্য একদল ঐতিহাসিকের মতে, এই স্থাপনাটি জৈন্তিয়ার কোনো খণ্ডরাজ্যের নয়; বরং এটি ছিল প্রাচীন মালনিয়াং রাজ্যের রাজবাড়ি

মালনিয়াং ছিল খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের একটি রহস্যময় ও শক্তিশালী রাজ্য। এর রাজধানী ছিল বর্তমান জাফলংয়ের বল্লাপুঞ্জি এলাকায়—এমন দাবি বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।

তবে মালনিয়াং রাজ্য কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আজও স্পষ্ট নয়।

‘বালা’ থেকে ‘জাফলং’?

২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘খাসিয়া জনগোষ্ঠী: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থের লেখক রুশ পতামের মতে, মালনিয়াং রাজ্যের রাজধানী একসময় অন্যত্র ছিল। পরে রাজ্যটির আয়তন কমে এলে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় ‘বালা’ নামের একটি স্থানে।

এই ‘বালা’কেই বর্তমান বল্লাপুঞ্জি বা বল্লাঘাট এলাকা বলে মনে করা হয়।

রুশ পতামের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘বালা’র কাছে রাজারা কিছু প্রস্তর ফলক স্থাপন করেছিলেন। স্থানীয় খাসিয়া ভাষায় এসব প্রস্তর ফলককে বলা হতো ‘ফ্লুং’। তাঁর মতে, ‘ফ্লুং’ শব্দ থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘ইয়াওফ্লাং’ এবং সেখান থেকে ‘জাফলং’ নামটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।

তবে এ ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়, বরং গবেষণালব্ধ একটি মত হিসেবে দেখা হয়।

মালনিয়াং রাজ্য কতটা বিস্তৃত ছিল?

মালনিয়াং রাজ্যকে ঘিরে পাওয়া বর্ণনাগুলো আরও চমকপ্রদ।

এইচ. এম. বারেহ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চৌধুরী এবং ডক্টর হোমিওয়েল লিংদহসহ বিভিন্ন গবেষকের লেখায় মালনিয়াং বা মাদুর মাস্কুট রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ডক্টর লিংদহের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাজ্যের শাসকদের বলা হতো ‘সিয়েম’ এবং স্থানীয় জনগণের কাছে তারা ছিলেন ‘গড কিং’ বা দেবতুল্য রাজা।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, মালনিয়াং রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল সিলেটের গোয়াইনঘাট থেকে খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় অতিক্রম করে আসামের বর্তমান নগাঁও জেলার ডিমারুয়া পর্যন্ত।

অর্থাৎ রাজ্যটি উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ একটি ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত ছিল বলে ধারণা করা হয়।

কিল্লং রাজা ও মালনিয়াংয়ের পতনের কাহিনি

মালনিয়াং রাজ্যের পতন নিয়েও রয়েছে নানা কিংবদন্তি।

ডক্টর হোমিওয়েল লিংদহের বর্ণনায়, একসময় পুরো জৈন্তিয়া পাহাড়ই মালনিয়াং রাজ্যের অধীনে চলে গিয়েছিল। পরে কিল্লং রাজা নিহত হওয়ার পর সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠী মালনিয়াং রাজ্য জয় করে নিজেদের রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়।

এরপর মালনিয়াং জনগোষ্ঠীর লোকজন খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

লিংদহের হিসাব অনুযায়ী, মালনিয়াং রাজ্যের পতন থেকে ব্রিটিশদের এই অঞ্চলে আগমন পর্যন্ত সাত প্রজন্মের সময় পার হয়েছিল। প্রতি প্রজন্ম ২৫ বছর ধরে হিসাব করলে তিনি রাজ্যটির পতনের সময়কাল আনুমানিক ১৬৫১ সাল বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে এই সময়কাল নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

বিজয় মাণিকের সময়েই কি জাফলং জৈন্তিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়?

ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলীর মতে, মালনিয়াং বা জাফলং খণ্ডরাজ্য ১৬৫১ সালের অনেক আগেই জৈন্তিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

তাঁর মতে, ১৫৬৪ সালের আগের কোনো এক সময়ে জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় মাণিক এই রাজ্য দখল করেছিলেন।

অন্যদিকে, মালনিয়াংয়ের শেষ রাজা কে ছিলেন, তা নিয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই। ডক্টর লিংদহ কিল্লং রাজাকে শেষ রাজা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবার অন্য ঐতিহাসিকদের মতে, শেষ রাজা ছিলেন মাইলং রাজা।

গবেষক রুশ পতাম আরও দুজন রাজার নাম উল্লেখ করেছেন—নিয়াং রাজা ও কন্দুর রাজা

অর্থাৎ বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে মালনিয়াং রাজ্যের অন্তত চারজন রাজার নাম পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের সময়কাল ও রাজত্বের ধারাবাহিকতা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

জৈন্তিয়ার খণ্ডরাজ্যগুলোর উত্থান

জৈন্তিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে মূল রাজ্যের আয়তন সংকুচিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে।

ত্রয়োদশ শতকের প্রথমদিকে জৈন্তিয়ার কৃষক রাজবংশের অন্যতম শক্তিশালী রাজা ছিলেন কামদেব। তাঁর মৃত্যুর পর জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক দুর্বলতা শুরু হয় বলে ঐতিহাসিকদের একাংশ মনে করেন।

এই দুর্বলতার সময় জৈন্তিয়ার কিছু ভূখণ্ড পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজা বা সরদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাদের হাতে গড়ে ওঠে কয়েকটি স্বাধীন বা আধা-স্বাধীন রাজ্য ও খণ্ডরাজ্য।

এর মধ্যে মালনিয়াং ছিল অন্যতম বৃহৎ। পাশাপাশি জৈন্তিয়ার ভূখণ্ডে ফালজুর ও চারিকাটা নামেও দুটি খণ্ডরাজ্যের উত্থান ঘটে।

ফলে একসময় মূল জৈন্তিয়া রাজ্য জয়ন্তাপুর ও তার আশপাশের কিছু এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

পরে আবার শক্তিশালী হয় জৈন্তিয়া

ইতিহাসের এই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।

ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে পাহাড়ি সিন্টেং জনগোষ্ঠীর হাতে জৈন্তিয়ার পুরোহিত রাজবংশের অবসান হলেও জৈন্তিয়া রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটেনি। বরং নতুন সিন্টেং রাজবংশের অধীনে জৈন্তিয়া আবার রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে সিন্টেং রাজারা জৈন্তিয়ার সীমানা বাড়াতে সক্ষম হন। মালনিয়াং বা জাফলং, চারিকাটা ও ফালজুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল জৈন্তিয়ার প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই সময় জয়ন্তাপুরী রাজ, জাফলং, চারিকাটা ও ফালজুর জৈন্তিয়ার গুরুত্বপূর্ণ চারটি ‘রাজ’ বা প্রশাসনিক অঞ্চলে পরিণত হয়।

ধ্বংসাবশেষই এখন ইতিহাসের সাক্ষী

আজকের জাফলংয়ে পর্যটকের চোখে প্রধান আকর্ষণ পাহাড়, নদী, পাথর আর সীমান্তঘেঁষা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু এর আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকশ বছরের পুরোনো এক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—জাফলং রাজবাড়ি।

রাজবাড়ির টিকে থাকা দেয়াল ও ফটক শুধু একটি পুরোনো স্থাপনার অংশ নয়; এগুলো জৈন্তিয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তন, পাহাড়ি রাজ্যগুলোর উত্থান-পতন এবং হারিয়ে যাওয়া রাজ্যগুলোর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।

তবে সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার অভাবে এই নিদর্শনগুলোও ক্রমেই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এলেও খুব কম মানুষই জানেন—এই ভূখণ্ডে একসময় রাজা, রাজ্য ও রাজধানীর অস্তিত্ব ছিল। পাথরের দেয়ালের অবশিষ্টাংশ যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের কাছেই ফিরে যাওয়ার একটি দরজা।

জাফলং রাজবাড়ি তাই শুধু একটি ধ্বংসাবশেষ নয়; এটি সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের এক অনুলিখিত অধ্যায়ের জীবন্ত স্মারক।