বিয়ের প্রস্তাব এলে একটি মুসলিম পরিবারে সাধারণত যে প্রশ্নগুলো সামনে আসে—ছেলে কী করে, কত আয় করে, বাড়ি-গাড়ি আছে কি না, পরিবারের সামাজিক অবস্থান কেমন। এসব বিষয় একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। কারণ সংসার পরিচালনার সামর্থ্য ও দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা বিয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিবেচ্য।

তবে ইসলামের দৃষ্টিতে পাত্র নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ছেলেটির দীন ও চরিত্র কেমন?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির দীন ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হওয়া গেলে তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব এলে তাকে বিবাহ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় সমাজে ফিতনা ও ব্যাপক অনাচার দেখা দিতে পারে। হাদিসটি সুনান আত-তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

1000120053.png

দীনদারি শুধু বাহ্যিক পরিচয় নয়

আমাদের সমাজে অনেক সময় দীনদারি বলতে শুধু নামাজ পড়া, দাড়ি রাখা কিংবা ধর্মীয় পোশাক পরাকে বোঝানো হয়। অথচ একজন মানুষের দীনদারির বাস্তব প্রকাশ তার আচরণ, লেনদেন, আমানতদারি, দায়িত্ববোধ ও মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে ফুটে ওঠে।

সে মিথ্যা বলে কি না, মানুষের হক নষ্ট করে কি না, হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে বাঁচায় কি না, দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—এসবও একজন মানুষের চরিত্র ও ধর্মীয়তার গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।

বিশেষ করে বিয়ের পর একজন পুরুষ তার স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” এই মর্মের হাদিস তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে।

অর্থাৎ বাইরে সবার কাছে ভদ্র, বিনয়ী ও ভালো মানুষ হওয়া যথেষ্ট নয়; ঘরের মানুষের সঙ্গেও তার আচরণ কেমন—সেটিও যাচাই করা জরুরি।

অর্থ-সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র মাপকাঠি নয়

ইসলাম একজন পুরুষের উপার্জনক্ষমতা ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বকে অস্বীকার করে না। বরং স্বামীর ওপর স্ত্রী ও পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের দায়িত্ব রয়েছে।

তাই পাত্রের আয়-রোজগার, পেশা, দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু শুধু অর্থসম্পদ দেখে পাত্র নির্বাচন করাও ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কারণ সম্পদ স্থায়ী নয়। আজ যার অনেক অর্থ আছে, কাল তার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও তাকওয়া তার দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বংশ নয়, তাকওয়াই প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি

বংশমর্যাদা নিয়েও আমাদের সমাজে অনেক বাড়াবাড়ি দেখা যায়। অথচ কোরআন মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে তাকওয়াকে সামনে এনেছে।

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে বলেন, মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।

সুতরাং কোনো ছেলে বড় বংশের, ধনী পরিবারের কিংবা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হলেই সে ভালো স্বামী হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তার নিজের চরিত্র, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ ও আচরণই মূল বিষয়।

পাত্রের রাগ ও আচরণ যাচাই করুন

পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত—রাগের সময় তার আচরণ কেমন?

এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বারবার বলেছেন, “রাগ করো না।” হাদিসটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে।

স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ অত্যন্ত ভদ্র হতে পারেন। কিন্তু রাগের মুহূর্তে তিনি কী করেন—গালাগালি করেন, অপমান করেন, ভয় দেখান, নাকি নিজেকে সংযত রাখেন—তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হবেই। মতবিরোধের সময় যে ব্যক্তি যুক্তি ও সংযমের পরিবর্তে হুমকি, অপমান বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবন নিয়ে সতর্কভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

তাই পাত্রের শুধু ভালো সময়ের আচরণ নয়, রাগ, মতবিরোধ ও চাপের পরিস্থিতিতে তার আচরণ সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া উচিত।

মেয়ের মতামত ও সম্মতি অপরিহার্য

ইসলামে মেয়ের বিয়েতে তার মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পূর্বে বিবাহিত নারীকে তার সঙ্গে পরামর্শ না করে এবং কুমারী নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না। সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার নীরবতাই তার অনুমতি হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি তখনই প্রযোজ্য, যখন মেয়েটি স্বাভাবিকভাবে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে এবং তার নীরবতা অনিচ্ছা, ভয় বা চাপের কারণে নয়।

অতএব, পরিবারকে পাত্র পছন্দ করার পাশাপাশি মেয়ের প্রকৃত মতামতও জানতে হবে। বিয়ে তার জীবনের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত; তাই তার সম্মতি ও মানসিক স্বস্তিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।

পাত্র যাচাই করবেন কীভাবে?

শুধু পাত্রের নিজের বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। তার সম্পর্কে বাস্তব তথ্য জানার চেষ্টা করা উচিত।

যেমন—

  • সে নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদতের ব্যাপারে কতটা যত্নশীল?

  • তার উপার্জনের উৎস হালাল কি না?

  • সে সত্যবাদী ও আমানতদার কি না?

  • বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণ কেমন?

  • নারীদের সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

  • রাগের সময় তার আচরণ কেমন?

  • ঋণ বা বড় আর্থিক দায় আছে কি না?

  • মাদক, জুয়া বা অন্য কোনো ক্ষতিকর অভ্যাস আছে কি না?

  • কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে তার সুনাম কেমন?

  • ভবিষ্যৎ স্ত্রী ও সংসারের দায়িত্ব সম্পর্কে তার বাস্তব ধারণা কী?

এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষদের কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।

শেষ কথা

ইসলামের শিক্ষা শুধু ‘ধনী ছেলে খোঁজো’ নয়, আবার শুধু ‘বড় বংশের ছেলে খোঁজো’ও নয়। এমনকি শুধু বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় দেখেও পাত্র নির্বাচন করা যথেষ্ট নয়।

যোগ্য পাত্র হলো এমন একজন মানুষ, যার দীন তার চরিত্রে প্রকাশ পায়, চরিত্র তার আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং দায়িত্ববোধ তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর প্রতি ব্যবহারে ফুটে ওঠে।

একজন মেয়ের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা শুধু বড় বাড়ি, দামি গাড়ি বা মোটা ব্যাংক ব্যালান্স নয়। সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো—এমন একজন জীবনসঙ্গী, যার কাছে সে তার সম্মান, বিশ্বাস, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করতে পারে।

তাই মেয়ের বিয়েতে পাত্র বাছাইয়ের সময় সম্পদ, পেশা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করুন; কিন্তু তার সঙ্গে দীন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, রাগ নিয়ন্ত্রণ, সততা ও নারীর প্রতি সম্মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন।

কারণ একটি ভালো পাত্র শুধু একটি মেয়ের স্বামী হন না—তিনি হয়ে ওঠেন একটি পরিবারের দায়িত্বশীল অভিভাবক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।