হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সহজ করতে নির্মাণ করা হয়েছিল জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রী হোস্টেল। তবে অবকাঠামো থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এর নিয়মিত কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। হোস্টেল বন্ধ থাকার কারণ, সেখানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ঘিরে তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হোস্টেলে থাকার সুযোগ থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই সেখানে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। তাদের ভাষ্য, শুধু একটি ভবন নির্মাণ করলেই আবাসিক ব্যবস্থা কার্যকর হয় না; শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে বাস্তবে আবাসিক কার্যক্রম কতটা নিয়মিত ও নিরাপদভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে।
হোস্টেলকে ঘিরে আগে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে যায়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল, তদন্তের মাধ্যমে কী ঘটেছিল, কারও দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় স্পষ্ট হবে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদক বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি জানতে পেরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জেলায় পাঠিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসনের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাকিলা রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শিক্ষক-কর্মচারীর ঘাটতিও
হোস্টেলের সমস্যার পাশাপাশি জামালগঞ্জ সরকারি কলেজে শিক্ষক-কর্মচারীর ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে বলে দাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
একটি সরকারি কলেজে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও কর্মচারী থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন শূন্য পদ পূরণ না হলে এর প্রভাব একদিকে যেমন পাঠদানে পড়তে পারে, অন্যদিকে প্রশাসনিক কাজেও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আবাসিক সংকটের পাশাপাশি জনবল সংকটও তাদের শিক্ষা পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। ফলে কলেজের অবকাঠামোগত সুবিধার পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সাবেক হোস্টেল সুপারকে ঘিরেও অভিযোগ
ছাত্রী হোস্টেলের আগের কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও তদন্তের ফলাফলের মাধ্যমে স্পষ্ট করা উচিত। এতে একদিকে যেমন অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হবে।
তিন প্রশ্নে আটকে হোস্টেলের ভবিষ্যৎ
বর্তমানে জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রী হোস্টেলকে ঘিরে মূলত তিনটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—হোস্টেলের নিয়মিত কার্যক্রম কেন বন্ধ ছিল, এ-সংক্রান্ত তদন্তে কী পাওয়া গেছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কীভাবে দূর করা হবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক-কর্মচারীর জনবল সংকট এবং সাবেক হোস্টেল সুপারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ। ফলে বিষয়টি এখন শুধু একটি হোস্টেল চালু বা বন্ধ থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং কলেজের সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে হোস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে নিয়মিত আবাসিক কার্যক্রম চালু করতে হবে।
হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মিত একটি সরকারি আবাসিক স্থাপনা যদি দীর্ঘদিন কার্যত ব্যবহারহীন থাকে, তাহলে এর উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। তাই শুধু হোস্টেলের দরজা খুলে দেওয়া নয়—কেন বন্ধ ছিল, কী ঘটেছিল, তদন্তের ফল কী এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব এখন জরুরি।




